শবে বরাত নিয়ে মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশারের আলোচনা

image
Description

শবে বরাত এর মর্মকথা:

1, এ রাতের বিশেষ কোন মর্যাদা আছে কি না?
2, এ রাতে বিশেষ কোন ইবাদাত আছে কি না?
3, এ রাতে কি সত্যিই ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়?
4, এ রাতের পরের দিন কোন নফল রোযা আছে কি?

ইসলাম কোন অনুমান নির্ভর ধর্ম নয়। বরং এর প্রতিটি বিষয়ের উপর আছে অসংখ্য দলীল- প্রমাণ।

অনুরূপভাবে রাত্রি কালীন নামাজ ও দিনের বেলায় রোযা কোন মূল্যহীন কর্ম নয়, বরং এর মাঝেও আছে অফুরন্ত সাওয়াব ও ফজিলত।

তবে নামাজ-রোযা সহ ইসলামের প্রতিটি ইবাদাতই দলীল ভিত্তিক হওয়া আবশ্যক। দলীল বিহীন কোন ইবাদাতই গ্রহণযোগ্য নয়।

এখন উপরোক্ত চারটি প্রশ্নের দলীল ভিত্তিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করছি-

1 নং প্রশ্নের উত্তর:
হাদীসে নববীতে এ রাতকে ليلة النصف من شعبان বা শাবান মাসের মধ্য রজনী বলা হয়েছে। যা এদেশে শবে বরাত নামে পরিচিত। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদীসে যা পাওয়া যায়-

*** আবু সালাবা আল খুশানী রা, বলেন রাসূল সা, বলেছেন- যখন মধ্য শাবানের রাত আসে, তখন আল্লাহ তা’আলা তার সৃষ্টি জীবের প্রতি দৃকপাত করেন। অতপর মুমিনদেরকে মার্জনা করে দেন। আর হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরায় লিপ্তদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন।

শায়খ আলবানী র, যিলালুল জান্নাহ ফী তাখরীজিস সুন্নাহ বইয়ের 224 নং পৃষ্ঠায় এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

এ রাতে মুশরিক ও নিন্দুক ব্যতীত সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দেয়া হয় মর্মে
1, আবু মুসা আশআরী, (ইবনু মাজাহ-1390)
2, আউফ বিন মালিক, (মুসনাদু বাযযার-2754)
3, আব্দুল্লাহ বিন আমর, (মাজমাউজ যাওয়াইদ-8/65)
4, মুআজ বিন জাবাল, ( ইবনু হিব্বান-1980)
5, আবুহুরায়রা, (মাজমাউজ যাওয়াইদ-8/65)
6, আবু বকর সিদ্দীক (মুসনাদু বাযযার-207) ও
7, আয়েশা রা, (তিরমিজি -739) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

যদিও এ হাদীস গুলো মুহাদ্দিসগণ জঈফ বলেছেন। কিন্তু উপরের একটি সহীহ হাদীস এ জঈফ হাদীসগুলোর ভীতকে মজবুত করে তুলেছে।
আর জঈফ হাদীসের সনদ সংখ্যা যখন বড়ে যায়, তখন তা হাসান পর্যায়ে উন্নীত হয়ে যায়।

সুতরাং এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে যেহেতু সহীহ ও হাসান হাদীস আছে, তাই এ রাতের ফজিলত নিয়ে দ্বীমত করা বাঞ্ছনীয় নয়।

2 +4 নং প্রশ্নের উত্তর :

এ রাতে ইবাদাত প্রসঙ্গে একাধিক হাদীস পাওয়া যায়।
*** উসমান ইবনু আবিল আস রা, থেকে বর্ণিত -রাসূল সা, বলেন- এ রাতে আল্লাহ তা’আলা ডেকে বলেন -কে আছ ক্ষমা চাওয়ার, আমি ক্ষমা করবো (বায়হাকী-3836)।

শায়খ আলবানী র, জঈফ আল জামে আস সগীর গ্রন্থের 94 পৃষ্ঠার হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন।

*** আয়েশা রা, বলেন- তিনি এ রাতে রাসূল সা, কে বাকীঈ’ আল গারকাদ কবরস্থানে উপরের দিকে মাথা তুলে দু’আ করা অবস্থায় পেয়েছেন (তিরমিজি -739)।

এ হাদীস প্রসঙ্গে ইমাম তিরমিজি র, হাদীস বর্ণনার পর নিজে বলেন- হাদীস টি জঈফ।

***আলী রা, বলেন- রাসূল সা, বলেছেন- মধ্য শাবানের রাতে (সালাত ও দুআয়) দণ্ডায়মান থাকো। পর দিন রোযা রাখো (ইবনু মাজাহ-1388)।

এ হাদীসের সনদের ইবনু আবি সাবরাহ নামক রাবী অত্যন্ত দূর্বল, কেহ বলেন- মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী। তাই এ হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয় (তাহযীবুত তাহযীব, 12/25-26)।

এ রাতের ইবাদাতের যে হাদীস গুলো পাওয়া গেলো , সে হাদীসগুলো দূর্বল বা অতিশয় দূর্বল। আর সহীহ কোন হাদীসে এ রাতের বিশেষ কোন ইবাদাতের কথা নেই। সূতরাং এ রাতের বিশেষ কোন ইবাদাতের ভিত্তি খুবই দূর্বল।

তাই বলে কি এ রাতে ইবাদাত করা যাবে না?

নিশ্চয়ই ইবাদাত করা যাবে, যেমনি ভাবে অন্যান্য রাতে ইবাদাত করা যায়। অন্যান্য রাতের ইবাদাত যেমন একাকী গোপনে হয়, সবাই মিলে সম্মিলিত ভাবে হৈ চৈ করে হয় না। এ রাতের ইবাদাতও হবে অন্যান্য রাতের মত একাকী ও গোপনে।

আর রোযা?

আলী রা, থেকে বর্ণিত শবে বরাতের পরের দিন রোযা রাখার হাদীসটি খুবই দূর্বল (তাহযীবুত তাহযীব, 12/25,26)।

তাই যে ব্যক্তি রোযা রাখতে চায় -সে 13,14 ও 15 তারিখের আইয়্যামে বীজের রোযা রাখবে। আর এ রোযাগুলো সহীহ হাদীস দিয়ে প্রমাণিত। শুধু 15 তারিখের একটি রোযা সহীহ হাদীসে নেই।

3 নং প্রশ্নের উত্তর :

এ রাতে ভাগ্য লিখা হয় মর্মে মা আয়েশা রা, থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে- রাসূল সা, বলেন – এ রাতে চলতি বছরে জন্ম ও মৃত্যু গ্রহণকারী আদম সন্তানদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতে আদম সন্তানদের আমল উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের রিযক অবতীর্ণ হয়।

হাদীসটি মিশকাত প্রণেতা ইমাম বায়হাকী থেকে রেওয়ায়েত করেন। (বায়হাকী-3/382-383)।

ইবনু হাজর আসকালনী র, তাহযীবুত তাহযীব গ্রন্থের 10/444 পৃষ্ঠায় বলেন- এ হাদীসটি অত্যন্ত দূর্বল।

তাকদীর তো আক্বীদার অংশ। আর এ পর্যায়ের দূর্বল হাদীস দিয়ে এ রাতে ভাগ্য নির্ধারণ হয় তা মোটেও সাব্যস্ত হয় না।
সুতরাং এ রাত ভাগ্য রজনী, এ কথার সহীহ কোন ভিত্তি নেই।

আশা করি শবে বরাত সম্পর্কে চিন্তাশীলদের জন্য একটু চিন্তার খোরাক এ পোষ্টে পাওয়া যাবে-ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.